২৯ ডিসেম্বর,২০১৫ সালে আমেরিকান কলেজ শিক্ষার্থী ওটো ওয়ার্ম্বিয়ার উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যান। বিশ্বের যেকোনো দেশের নাগরিক হিসেবে নর্থ কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া একটি দুঃসাহসিক কাজ বটে। কিন্তু সেই দুঃসাহসিকতাকে মর্মান্তিকতায় রূপান্তর করেছিলেন ওটো।

Otto Warmbier | উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া সেই আমেরিকান যুবকের সাথে কি ঘটেছিল
Otto Warmbier

আমেরিকার ওহায়ো রাজ্যের সিনসিনাটিতে জন্ম গ্রুহণ করেছিলেন ওটো ওয়ার্ম্বিয়ার। সেখানের Wyoming High School এর শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে স্কুল থেকে উর্ত্তীন হওয়ার পর তিনি University of Varginia তে মেজর ডিগ্রি হিসেবে ব্যবসায়ী শিক্ষা ও অর্থনীতির উপর পড়াশুনা শুরু করেন। একই সাথে London School of Economics এ তিনি বৈদেশিক বিনিময় বিষয়ে অধ্যায়ন করছিলেন। তার মাইনর ডিগ্রি হিসেবে ছিল টেকসই বৈশ্বিকতা। বিভিন্ন সাংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ থাকায় তিনি ইকুয়েডর, কিউবা এবং ইউরোপের বেশ কিছু দেশে ভ্রমণ করেন।এছাড়াও তার মা একজন ইহুদি হওয়ায় তিনি বার্থরাইট ইসরাইল

এর স্পন্সরশীপে ১০ দিনের জন্য ইসরাইল ভ্রমণ করেন।

২০১৬ সালে ওয়ার্ম্বিয়ারের হংকং এ পড়ালেখা শুরু করার কথা থাকায় সে তার আগে নিউ ইয়ারের সময় উত্তর কোরিয়া ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। চীন ভিত্তিক ভ্রমণ সংস্থা Young Pioneer Tours সাহায্যে সে এই ভ্রমণ করেন। তাদের গ্রুপে বেশ কিছু আমেরিকার নাগরিক ছিলেন। তারা ৫ দিনের নিউ ইয়ার ট্রিপে ২৯ ডিসেম্বর বেইজিং হয়ে উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করেন। তারা Yanggakdo International Hotel এ অবস্থান করেন। ১লা জানুয়ারি তারা Kim Il-sung Sqaure এ নিউ ইয়ার উদযাপন করেন। এরপর তারা হোটেলে ফেরত আসেন এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন মদ্যপান করেন। রাত প্রায় ২টার দিকে মদ্যপ অবস্থায় তিনি হোটেলের একটি সংরক্ষিত স্থানে প্রবেশ করেন এবং একটি পোষ্টার চুরি করার চেষ্টা করেন বলে পরবর্তিতে দাবী করে উওর কোরিয়া সরকার।

Otto Warmbier | উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া সেই আমেরিকান যুবকের সাথে কি ঘটেছিল
উত্তর কোরিয়ায় দলের সাথে ওটো ওয়ার্ম্বিয়ার

অতপর ট্রিপের শেষ দিনে তার ট্যুর গ্রুপের সাথে Pyongyang International Airport এ উত্তর কোরিয়া থেকে প্রস্থানের জন্য বিমানের অপেক্ষায় থাকার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ড্যানি গরটন নামক এক ব্রিটিশ নাগরিক তাদের ট্যুর গ্রুপের সদস্য ছিলেন। তিনি ওয়ার্ম্বিয়ারের গ্রেফতারের প্রসঙ্গে বলেন,”

“তারা কোনো কথা বলে নি। দু’জন রক্ষী এসেছিল এবং কেবল অট্টোর কাঁধে চেপে ধরল এবং তাকে বাইরে নিয়ে গেল। আমি কেবল বেশ উদ্বেগজনকভাবেই বলেছিলাম, ‘আচ্ছা, এটিই হয়তো আমরা তোমাকে শেষ দেখব।’ এই শব্দগুলির মধ্যে একটি দুর্দান্ত বিড়ম্বনা ছিল। এবং সেটাই শেষ, শেষবারের মত ওটো’কে আমরা শারিরীকভাবে দেখেছিলাম। অটো তাদেরকে বাধা দেয় নি। সে ভয় পেল না। তার মুখে মৃদ্যু হাসি ছিল।”
Otto Warmbier | উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া সেই আমেরিকান যুবকের সাথে কি ঘটেছিল
গ্রেফতারের পর Otto Warmbier

দলটির বিমান টার্মিনাল ছাড়ার আগ মুহুর্তে, একজন কর্মকর্তা জাহাজে এসে ঘোষণা করেন যে,”ওটো খুব অসুস্থ এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।” কিছু মিডিয়ার রিপোর্টে যদিও বলা হয় যে ওয়ার্ম্বিয়ার গ্রেফতার হওয়ার পর ইয়ং পাইওনিয়ার সংস্থার ট্যুর গাইডের সাথে ফোনে কথা বলেছিলেন।” তবে একজন ইয়ং পাইওনিয়ারের মুখপাত্র বিবিসি নিউজকে এ বিষয়ে অস্বীকার করে বলেছিলেন,”ওটোকে নিয়ে যাওয়ার পরে কোনো কর্মচারীরই তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল না।”

আরো পড়ূন: বাংলার সুয়েজ খাল খ্যাত গাবখান চ্যানেল সম্পর্কে জেনে নিন।
আরো পড়ুন: ফ্লাইট ৪৭২: হাইজ্যাক হওয়া জাপানি বিমানের ঢাকায় ৫ দিন!!

উত্তর কোরিয়ার সরকারী সংবাদ সংস্থা “কোরিয়ান কেন্দ্রীয় সংবাদ সংস্থা (কেসিএনএ)” প্রাথমিকভাবে ঘোষণা করেছিল যে,” ওয়ার্ম্বিয়ারকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বৈরী আচরণের জন্য আটক করা হয়েছে।” কিন্তু উত্তর কোরিয়া প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে তার অন্যায়ের যথাযথ প্রকৃতির বিষয়ে বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, যদিও একজন ইয়ং পাইওনিয়ার ট্যুরের একজন রয়টার্সকে ইয়াংগাকদো হোটেলে ঘটনাটি ঘটেছে বলে তখন জানান । ২৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ তারিখে একটি সংবাদ সম্মেলনে ওয়ার্ম্বিয়ার একটি পূর্ব লিখিত প্রস্তুত বিবৃতি পাঠ করে স্বীকার করেছেন যে তিনি বাড়ি নেওয়ার জন্য ইয়াংগাকদো হোটেলের দ্বিতীয় তলার হোটেল কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা থেকে একটি প্রচারমূলক পোস্টার চুরি করার চেষ্টা করেছিলেন। যে পোস্টারে লেখা ছিল (কোরিয়ান ভাষায়), “আসুন সবাই আমরা দৃঢ়তার সাথে কিম জং-ইল এর দেশপ্রেমের সাথে হাত তুলি!” উত্তর কোরিয়ার নেতার নাম বা ইমেজের সাহায্যে এ জাতীয় জিনিসগুলি ক্ষতিগ্রস্ত করা বা চুরি করা উত্তর কোরিয়ার সরকার গুরুতর অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়।

তবে স্বীকারোক্তিটি জোরপূর্বক করা হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি, কারণ ওয়ার্ম্বিয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পরে কখনও চেতনা ফিরে পাননি। ওয়ার্ম্বিয়ারের স্বীকারোক্তিতে আরও বলা হয়েছিল যে তিনি তার নিজের শহরে একটি মেথোডিস্ট চার্চের নির্দেশে পোস্টারটি চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন এবং ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গোপনীয় সংঘ, জেড সোসাইটি’তে তিনি যোগ দিতে চেয়েছিলেন এবং উভয় প্রতিষ্ঠানই মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাথে জোটবদ্ধ ছিল। পরবর্তিতে এই দাবিগুলিকে দ্যা টাইম ম্যাগাজিন “কল্পনাপ্রসূত” এবং “অবজ্ঞাযোগ্য” বলে অভিহিত করেছিল, চার্চ এবং জেড সোসাইটি উভয়ই এই বিষয় অস্বীকার করে। নিউইয়র্ক টাইমস মন্তব্য করেছিল যে “বিবরণটির তাদের সন্দেহস্বরূপ লিপিবদ্ধ করে মি:ওয়ার্ম্বিয়ার উত্তর কোরিয়ার ইন্টেরোগেটররা দিয়েছিলেন।”

Otto Warmbier | উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া সেই আমেরিকান যুবকের সাথে কি ঘটেছিল
উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্টে ওটো

১লা মার্চ, ২০১৬ সালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিল রিচার্ডসন নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যালয় থেকে উত্তর কোরিয়ার দু’জন কূটনীতিকের সাথে ওয়ার্ম্বিয়ারের মুক্তির জন্য দাবী করার কয়েক ঘন্টা পরে উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্টে ওয়ারম্বিয়ার বিচার করা হয়েছিল এবং তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল । উত্তর কোরিয়ার ফৌজদারী কোডের ৬০ অনুচ্ছেদের অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে নীতিবিরোধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। আদালত বলেছিল যে, “সে পর্যটক হিসাবে প্রবেশের পরে উত্তর কোরিয়ার জনগণের ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্থ করার জন্য [উত্তর কোরিয়ার] প্রতি মার্কিন সরকারের বৈরী নীতি অনুসারে একটি অপরাধ করেছে। তার প্রমাণ এক ঘন্টা স্থায়ী হওয়া এই বিচারে তার স্বীকারোক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ, আঙুলের ছাপের প্রমাণ এবং সাক্ষীর সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।” ১৮ ই মার্চ, ২০১৬ সালে KCNA একটি সংক্ষিপ্ত নিম্ন-রেজোলিউশন ভিডিও প্রকাশ করেছে, যখন সময় ছিল রাত ১.৫৭, সিসিটিভি ফুটেজে একজন লোককে দেখানো হয়েছিল,(যিনি উত্তর কোরিয়ার গাইড দ্বারা ওয়ার্ম্বিয়ার হিসাবে চিহ্নিত) হোটেল কর্মীদের জন্য সংরক্ষিত অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। দেখা যায় একটি দেয়াল থেকে একটি পোস্টার সরিয়ে ওয়ার্ম্বিয়ার ফ্লোরে রেখেছিল। ওয়ার্ম্বিয়ার তার স্বীকারোক্তিতে বলেন যে পোস্টারটি বহন করার পক্ষে খুব বড় ছিল তা বোঝার পরে তিনি তা ত্যাগ করেছিলেন। ওয়ার্ম্বিয়ারকে ১৫ বছরের কঠোর স্বশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শুনানিকে একটি ক্যাঙ্গারু আদালত বলে অভিহিত করে এবং এই দণ্ডটিকে “ক্ষোভজনক ও মর্মাহত” বলে বর্ণনা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মার্ক টোনার বলেছিলেন যে,
“এটা পরিষ্কার যে উত্তর কোরিয়া আমেরিকান নাগরিককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করেছিল যদিও তাদের দাবি বিপরীত।”

 

পরবর্তী সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশিত হয়েছে যে, ৬ জুন, ২০১৭ সালে নিউইয়র্কের একটি সভায় উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তারা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বিশেষ প্রতিনিধি জোসেফ ইউনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ওয়ার্ম্বিয়ার তার সাজা দেওয়ার কিছুদিন পরেই খাদ্যজনিত ব্যাক্টেরিয়াল বোটুলিজমের সংক্রমণে সংক্রমিত হয়েছিলেন এবং ঘুমানোর বড়ি সেবনের ফলে কোমায় চলে গিয়েছিলেন। ইউনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ওয়ার্ম্বিয়ারের প্রত্যাবাসন পর্যবেক্ষণের জন্য পিয়ংইয়াংয়ে রওনা হয়েছিল।
১৭ মাস কারাগারে কোমায় থাকা অবস্থায় ১২ জুন ২০১৭ সালে ওটো অয়ার্ম্বিয়ার-কে উত্তর কোরিয়া মুক্তি দেয়।

Otto Warmbier | উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া সেই আমেরিকান যুবকের সাথে কি ঘটেছিল
১৩ জুন বিমান থেকে নামার সময় ওটো ওয়ার্ম্বিয়ার

দ্রুততার সাথে তাকে ১৩ ই জুন, ২০১৭ তারিখে ওহাও’র সিনসিনাটি নিয়ে আসা হয়। তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসার জন্য তাঁকে University of Cincinnati Medical Cente নেওয়া হয়।কিন্তু ওয়ার্ম্বিয়ার আর কখনও চেতনা ফিরে পাননি এবং ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার মাত্র ছয়দিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবজনিত অজানা আঘাতের কারণে তিনি মারা কোমায় চলে গিয়েছিলেন।কিন্তু অভ্যন্তরীণ স্ক্যানগুলিতে তার মাথার খুলিতে কোনও ফ্র্যাকচারের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

Otto Warmbier | উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া সেই আমেরিকান যুবকের সাথে কি ঘটেছিল
২০১৮ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত উত্তর কোরিয়া সরকার কে ওয়ারম্বিয়ারের বাবা-মায়ের পক্ষে একটি পূর্বনির্ধারিত রায় হিসাবে ওয়ারম্বিয়ার নির্যাতন ও মৃত্যুর জন্য উত্তর কোরিয়ার সরকারকে দায়বদ্ধ বলে মনে করেছে।২০১৯ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের ব্যাপারে এই কথা বলে পরে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন যে,”ওয়ার্ম্বিয়ারের মৃত্যুর জন্য কিম দায়ী নয়।” জবাবে, ওয়ার্ম্বিয়ারের বাবা-মা কিম এবং তার দুষ্ট শাসনের পক্ষপাত করায় ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন।

আরো পড়ুন: ঢাকার সর্বপ্রথম মসজিদ সম্পর্কে জেনে নিন।
আরো পড়ুন: ওয়াল্ড ওয়াইড ওয়েব (www) দিবস আজ। চলুন জেনে নেই www সম্পর্কে ৭ টি মজার তথ্য।
আরো পড়ুন: রাশিয়ানদের সাগর গায়েব করার ইতিহাস।
আরো পড়ুন: লালার মাধ্যমে হবে ব্যাথামুক্ত ডায়াবেটিস পরীক্ষা। Painless Salivary Diabetics Test

আপনার মন্তব্য জানাবেন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন