দানবগর্তঃ বিশ্বের নতুন এক আতঙ্কের নাম

দাঁড়িয়ে আছেন কিম্বা ঘরে বসে নেটফ্লিক্সে আপনার পছন্দের ডার্ক সিরিজটি গভীর মনযোগ দিয়ে দেখছেন । হঠাৎ আপনি অনুভব করলেন আপনিসহ আপনার প্রিয় বাড়িটি মাটির নিচের দিকে চলে যাচ্ছে । তখন নিজেকে স্বাভাবিক রাখাটাই বা কতটুকু স্বাভাবিক ?

অদ্ভুত হলেও সত্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখন নতুন আতংকের নাম ‘দানবগর্ত ‘ বা ইংরেজিতে সিংকহোল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ তুরস্কের কোনিয়া রাজ্য এই আতংকের শীর্ষে রয়েছে। রাজ্যের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক একটি জরিপ করতে গিয়ে দেখেছেন , রাজ্যটিতে প্রায় ৬০০ টি দানবগর্তের অস্তিত্ব রয়েছে এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ৬০০ টি গর্তের ৩৬০ টির জন্মই হয়েছে ২০২০ সালে ।

প্রকৃতি যেমন মানুষের মনের ভেতরে মায়ার জন্ম দিতে জানে, তেমনি জানে মানুষের ভয়ের কারণ হতে । খুবই নাটকীয়ভাবে তৈরী হওয়া বিপর্যয় সিংকহোল তৈরী হবার পেছনে বড় অংশ হিসেবে আমরা মানুষেরাই দায়ী বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন দানবগর্ত তৈরীর পেছনে বড় একটি কারণ । ভূতত্ত্ববীদগণ একে বলেন ‘কারস্ট ট্রেইন’ । পানি উত্তোলন অনেকগুলো কারণের একটি। আরো বেশ কিছু কারণ রয়েছে ।

মাটির অভ্যন্তরে কঠিন শিলা রয়েছে এমন সব এলাকায় সাধারনত ভূমির উপরিভাগের পানি ধীরে ধীরে শিলার অভিমুখে বা মাটির ভেতরে প্রবেশ করে। দীর্ঘদিন সময় পরে সেখানে তৈরী হয় লবণ, চুনাপাথর, কপার ও জিপসামের মতো খনিজ স্তর। খনিজ পদার্থের উত্তোলন করা হলে মাটির অভ্যন্তরীন সেই অংশজুড়ে তৈরী হতে থাকে ফাঁপা যায়গা। সময়ের পরিক্রমায় হঠাত মাটির উপরিভাগ দেবে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে সেই অংশজুড়ে।

কপার খনি হিসেবে বর্তমানে ব্যবহার হওয়া ‘চুকুইচামাতা’ দানবগর্তটি চিলিতে অবস্থিত । ১৯১০ সাথে তৈরী হইয় ২৭৯০ ফুট গভীরের এই দানবগর্তটি । আধুনিক বিশ্ব গড়তে গিয়ে মাটির নিচ দিয়ে স্থাপনা কিম্বা অবকাঠামো তৈরীর কাজ ক্রমেই বেড়ে চলেছে । শহরগুলোতে সিংকহোল তৈরি হবার অনেকগুলো কারণের এটিও একটি ধরা যেতে পারে ।

শুধু তাই নয়, বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফও) ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে বলছে, গত সাত বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে। অবাক করা তথ্য হলো, প্রতিবেদনে তারা উল্লেখ করেছে বিশ্বে প্রতিবছর বাংলাদেশের সমপরিমাণের বনভূমি উজার করা হচ্ছে। যেখানে একটি গাছ কাটলে দুটি গাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছে, সেখানে গাছ লাগানো তো দূরে কথা, নির্দ্বিধায় বন উজার করে শিল্পকারখানা তৈরী হচ্ছে। বৈশ্বিক বিপর্যের সম্মুখীন হবার ভয়াবহতার আভাস এই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দানবীয় গর্ত তৈরিতে। বিশ্বনেতাদের অবশ্য এ নিয়ে কপালে চিন্তার ভাজও পড়েছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ভয়াবহ তান্ডব আমরা দেখেছি । ঝড়– জলোচ্ছ্বাসের মতোই নিয়মিত হয়ে পড়ছে দানবগর্ত তৈরির ঘটনা। এই মূহুর্তে সচেতন না হলে যে আমাদেরকে বড় রকমের বিপদের হিসেব গুনতে হবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

আর্টিকেলটি লিখেছেনঃ

মোঃ খশরু

ঢাকা কলেজ

আরো পড়ুনঃভূমিকম্পের আগাম সংকেত যেভাবে পায় জন্তুরা

আপনার মন্তব্য জানাবেন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন