বুধবার, মে ১৮, ২০২২

ফোনালাপ ফাঁস: বাংলাদেশে ফোনালাপ গোপনে রেকর্ড করে ফাঁস করা কি অপরাধ?

সম্প্রতি দেশে আইনমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা, ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতার ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময় ফোনআলাপের অডিও ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও এসব ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি সরকার।

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলেছেন, অডিও ফাঁসের কোন ঘটলে তারা সাধারণত এর পরবর্তী ঘটনাবলী মনিটর করে থাকেন।  কিন্তু টেলিফোন আলাপের অডিও ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের কেন চিহ্নিত করা যাচ্ছে না-এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

টেলিফোন আলাপ রেকর্ড এবং ফাঁস করা-এই দু’টোই আইনে গুরুতর অপরাধ।

কিন্তু এরপরও হরহামেশাই ফাঁসের ঘটনা ঘটছে দীর্ঘদিন ধরে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এপর্যন্ত সরকার বিরোধী রাজনীতিকদের টেলিফোন আলাপ ফাঁসের ঘটনা বেশি ঘটেছে। বিভিন্ন সময় সাধারণ নাগরিকেরও ফোন আলাপ ফাঁস হয়েছে। এসব কোন ঘটনার তদন্ত হয়েছে-কখনও তা জানা যায়নি। ফোনালাপ ফাঁস

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন,
“ফোন আলাপ ফাঁসের উৎস সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য জানা যায়না। কিন্তু ফোনে আড়ি পাতা এবং ফোনালাপ প্রকাশ নিয়ে বাংলাদেশের আইনে সুস্পষ্ট কিছু আইনে উল্লেখ নেই”

তিনি আরো বলেন,”বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইনে একটি ধারা আছে যেখানে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা সংস্থা যদি প্রয়োজন মনে করে, তদন্তের স্বার্থে বা মামলার স্বার্থে হতে পারে, তাহলে টেলিফোন সেবা দাতা সংস্থা তাদের সব রকমের তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু তারা যে কারো ফোনে আড়ি পাততে পারবে – এমন কোন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা বা ক্ষমতা দিয়ে কোন আইনি বিধান নেই। বরং উল্টোটা আছে। যেকোন নাগরিকের ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধান।”

২০০১ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন পাস হয়, পরবর্তীতে ২০১০ সালে সেই আইনটি সংশোধন করা হয়। এ আইনে ফোনে আড়ি পাতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে। তবে, গোয়েন্দা সংস্থা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, তদন্ত সংস্থার মতো সরকারি সংস্থাগুলোর বাইরে যে কোন ব্যক্তির কথোপকথন আড়ি পেতে রেকর্ড করলে বা প্রচার করলে দুই বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ফোনালাপ ফাঁস

কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলো তদন্তের স্বার্থে বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কোন নাগরিকের ফোনে আড়ি পাততে চাইলে কি তাদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়? মিঃ বড়ুয়া বলেছেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা এসব বিষয়ে যেকোন কর্মকর্তাকে সরকারের অনুমতি নিতে হয়, কিন্তু যেহেতু আইনে এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা নেই, সে কারণে অনেক সময়ই বিষয়গুলো নিয়ে কড়াকড়ি তেমন থাকেনা।

তবে, নির্দিষ্ট কোন নাগরিকের কর্মকাণ্ড যদি রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বা হুমকি না হয়, তাহলে আদালতের নির্দেশনা ছাড়া কারো ফোনে কেউ বৈধভাবে আড়ি পাততে পারবে না।

কিভাবে ফাঁস হয় ফোনালাপ?

এ পর্যন্ত যতগুলো ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, সেসবের কোন উৎস জানা যায় না। কিন্তু কিভাবে একজন নাগরিকের ফোনে আড়ি পাতা যায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক রিজভী শাহরিয়ার বলছেন, সেলফোন স্পাইং বা সেলফোন সার্ভেইলেন্স বা নজরদারির মাধ্যমে ফোন ট্র্যাক করা, কথোপকথন রেকর্ড করা এমনকি টেক্সট মেসেজও পড়া যায়। ফোনালাপ ফাঁস

কখন আদালতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে ফোন আলাপের রেকর্ড?

কোন প্রক্রিয়ায় ফোন আলাপের রেকর্ডিং করা হলে তা আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে আইনজীবীদের মধ্যে।

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের জন্য ফোনের কথোপকথন বা বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য রেকর্ড করতে হলে সরকার গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা সংস্থা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতা প্রদান করতে পারবে। তবে শুধুমাত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী অথবা প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে এই বিধান প্রয়োগ করা যাবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, “যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বা প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদন নেয়ার পর কোনো সংস্থা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কারো ফোনে আড়ি পেতে সেই রেকর্ডিং আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে, কেবল সেই রেকর্ডিং আদালতে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।”

তবে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ এই বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন মামলার গুরুত্ব ভেদে এসব ক্ষেত্রে আদালত ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।

পাট রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা এখনও নেতিবাচক

“যদি দুইজন ফোনে পরামর্শ করে অপরাধ সংঘটন করে, আদালতের কাছে তাদের ঐ কল রেকর্ড আসে এবং তাদের ঐ কল রেকর্ড সম্পর্কে আদালত নিশ্চিত হতে পারে – তখন সেই রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে”, বলেন শফিক আহমেদ।

কারো অজান্তে তার ফোন আলাপ রেকর্ড করা বা তা সংগ্রহ করা নাগরিকের অধিকারের লঙ্ঘন কি না – সেই প্রশ্নের উত্তরে মি. আহমেদ বলেন, “যখন দুইজন শলা পরামর্শ করে কোনো অপরাধ সংঘটন করে, তখন অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে অপরাধীদের ফোন আলাপ রেকর্ডিংকে গুরুত্ব দিতে পারে আদালত।”

পাট রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা এখনও নেতিবাচক

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি বৈধভাবে ফোনালাপ রেকর্ড করতে পারে?

২০০১ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন পাস হয়, পরবর্তীতে ২০১০ সালে সেই আইনটি সংশোধন করা হয়। এ আইনে ফোনে আড়ি পাতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে।

কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলো তদন্তের স্বার্থে বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কোন নাগরিকের ফোনে আড়ি পাততে চাইলে কি তাদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়?

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান জানান রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিধিমালা অনুসরণ করেই অনেক সময় ব্যক্তির ফোন কল রেকর্ড করে থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

“টেলিফোনে আড়িপাতা সংক্রান্ত আইনে ২০১৪ সালে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। ঐ পরিবর্তনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে কারো ফোনে আড়িপাতা বা কথোপকথনের রেকর্ড আইনিভাবে সংগ্রহ করার সুযোগ তৈরি হয়”, বলেন মোখলেসুর রহমান।

জঙ্গি তৎপরতা ঠেকাতে, বিদেশী গুপ্তচর সন্দেহ করলে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এনটিএমসি’র (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেল) সহায়তায় কারো ফোন কল রেকর্ড করতে চাওয়ার আবেদন করতে পারে বলে জানান মি. রহমান।

তবে, নির্দিষ্ট কোন নাগরিকের কর্মকাণ্ড যদি রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বা হুমকি না হয়, তাহলে আদালতের নির্দেশনা ছাড়া কারো ফোনে কেউ বৈধভাবে আড়ি পাততে পারবে না।

তবে আইনজীবীদের কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জন শৃঙ্খলা এসব বিষয়ে যে কোন কর্মকর্তাকে সরকারের অনুমতি নিতে হলেও যেহেতু আইনে এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু বলা নেই, সে কারণে অনেক সময়ই বিষয়গুলো নিয়ে কড়াকড়ি তেমন থাকেনা।

Source:
গোপনে ফোনালাপ রেকর্ড: কারা এর পেছনে এবং কারা ফাঁস করছে তার তদন্ত হয় না কেন? -কাদির কল্লোল
বাংলাদেশে আড়িপাতা: ফোনালাপ গোপনে রেকর্ড করে ফাঁস করা কি অপরাধ? -সাইয়েদা আক্তার
ফোন আলাপ রেকর্ড করা নিয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলে? -BBC বাংলা

 

Similar Articles

Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Advertismentspot_img

Instagram

Most Popular