বুধবার, মে ১৮, ২০২২

পাট রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা এখনও নেতিবাচক

পাট রপ্তানিতে চলতি অর্থবছরের (২০২১- ২০২২) শুরু থেকেই গতি হারাতে থাকে বাংলাদেশ। তবে, গত কয়েক মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এরপরেও চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাস অর্থাৎ, জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে পাট পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৯% এর বেশি। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বিভিন্ন দেশে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে ১০৩ কোটি ৫৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ফলে গত বছর দেশের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমান বিদেশি মুদ্রা আয় হয় এই খাত থেকে।

বুধবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পাট ছাড়া অন্যান্য প্রায় সব পণ্যেরই রপ্তানি বেড়েছে।

কিন্তু পাটের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারা কেনো ধরে রাখতে পারলো না বাংলাদেশ?

এ খাতে নিয়োজিত উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে গতি হারানোর মূল কারণ সম্প্রতি কাঁচাপাটের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া; ফ্রেইট চার্জ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এছাড়া, পাট পণ্য রপ্তানির অন্যতম বড় গন্তব্য ভারত ২০১৭ সালে বাংলাদেশি পাট পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে, যা রপ্তানি কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারতের ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর দেশটিতে ২০১৭ সালের আগের তুলনায় বাংলাদেশের পাট পণ্য রপ্তানি কমেছে ৬০ শতাংশ।

বাংলাদেশ পাটকল সমিতির (বিজেএমএ) সাধারণ সম্পাদক আবদুল বারিক খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “বর্তমান বাড়তি দামে পাট কিনে রপ্তানি করতে যে ব্যয় হয়, তা দিয়ে বায়াররা নিতে চায় না।”

বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেজিইএ)-এর পরিচালক ইসরাত জাহান চৌধুরী কাঁচাপাটের বর্ধিত মূল্যকে রপ্তানি কমার পেছনে অন্যতম কারণ বলে জানান।

টিবিএস-কে তিনি বলেন, “আমরা চাই কাঁচা পাটের দাম স্থিতিশীল থাকুক।”

পাট পণ্য রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে কাঁচাপাটের দাম ছিল মণপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। গত মৌসুমে পাটের দাম ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা হয়ে যায়। আর চলতি মৌসুমে পাটের দাম কিছুটা কমে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ইসরাত জাহান চৌধুরী মনে করেন, বর্তমানে কাঁচা পাটের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল। তবে, এই দাম ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে থাকলে রপ্তানি বাড়বে এবং কৃষকরাও বাঁচবে।

ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল ৪১ শতাংশ। গত কয়েক মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়াতে তা ৯ শতাংশে নেমেছে; অর্থাৎ, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।

এ ব্যাপারে আব্দুল বারিক খান বলেন, “অনেক উদ্যোক্তা বায়ার ধরে রাখতে সামান্য মুনাফা, মুনাফা ছাড়া কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে লোকসানেও পণ্য রপ্তানি করছেন। এ কারণে হয়তো রপ্তানি আয় বেশি দেখা যাচ্ছে।”

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মাসে পাট পণ্য থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৬৯৬ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৬৬ মিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত পাট পণ্যের তালিকায় রয়েছে কাঁচাপাট, পাটের সুতা, পাটের বস্তা ও ব্যাগ এবং অন্যান্য পাটজাত পণ্য। ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে পাট থেকে তৈরি সুতা, বস্তা ও ব্যাগ রপ্তানি কমলেও কাঁচাপাট এবং অন্যান্য পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। তবে টাকার অঙ্কে সার্বিকভাবে এ খাতের রপ্তানি কমেছে।

এ বছর জানুয়ারি মাসে পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৪০৮ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা মাসের পুরো রপ্তানির ৮৪.২১%।

অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ২ হাজার ৩৯৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সাত মাসের আয়ের চেয়ে ৩০.৩০% বেশি।

জানুয়ারি মাসে নিট ও উভেন- দুই ধরনের পণ্য রপ্তানিই বেড়েছে। সাত মাসে ১৩২৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের নিট পণ্য রপ্তানি হয়েছে, তাতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৮৯%।

আর এক হাজার ৭১ কোটি ডলারের উভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে এই সাত মাসে, তাতে প্রবৃদ্ধি দাাঁড়াচ্ছে ২৭.২৩%।

রপ্তানি আয়ে সামগ্রিকভাবে উন্নতি হলেও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে।

৬৯ কোটি ৫০ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে অর্থবছরের গত সাতমাসে; যাদিও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৩ কোটি ডলারের।

গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৭৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর অর্থ পাটপণ্য খাতে রপ্তানি আয় কমেছে ৯.১৩%।

অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৮৩ কোটি ১৩ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে; ফলে এটিই এখন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিখাত। গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় হোমটেক্সটাইল খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০%।

এবার জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৭৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে, প্রবৃদ্ধি ২৬.৬৩%।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৬৮ কোটি ২৭ লাখ ডলারের; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯.৬৬%। রপ্তানিতে চামড়া খাতের অবস্থান এখন চতুর্থ।

পাখির পালক ও মানব চুল (উইংস অ্যান্ড হিউম্যান হেয়ার) রপ্তানি ১০৬% বেড়েছে গতবছরের প্রথম সাত মাসের ‍তুলনায়। এবার ৫ কোটি ৬৩ লাখ ডলার এসেছে অপ্রচলিত এই খাত থেকে।

হেডগিয়ার ও টুপি র’প্তানিতেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬১%। এই খাত থেকে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।

প্রকৌশলপণ্য র’প্তানি করে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ ডলার এসেছে, তাতে ৫৮% প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এছাড়া রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তালিকায় সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত এবং জীবন্ত মাছ, কৃষি পণ্য, বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, রাসায়নিক পণ্য এবং প্লাস্টিক পণ্য।

আরো পড়ুন:
গত জানুয়ারির তুলনায় রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ৪১%
নাটকীয় মোড় নিল শিল্পী সমিতির নির্বাচন

Similar Articles

Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Advertismentspot_img

Instagram

Most Popular