ফ্লাইট ৪৭২ হাইজ্যাকের সালটা ছিল ১৯৭৭। বাংলাদেশে তখন সৈরশাসন চলছে। সে বছর ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি এ এস এম সায়েমকে সরিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন মেজর জিয়াউর রহমান। তার প্রশাসনের অন্যতম ছিলেন এয়ার ফোর্সের তৎকালীন চিফ অফ স্টাফ এবং জিয়া প্রশাসনের ডেপুটি চিফ এয়ার ভাইস মার্শাল এ. জি. মাহমুদ। একইসাথে তিনি ছিলেন তৎকালীন বিমান পরিবহন মন্ত্রী। তিনি এই গল্পের নায়ক। চলুন তবে শুরু করা যাক একদম শুরু থেকে।

ফ্লাইট ৪৭২

ডগলাস ডি.সি.-৮ ছিল আমেরিকায় তৈরি ন্যারো-বডি-এয়ারলাইনার বিমান। বিমানটির ফ্লাইট নাম্বার ছিল ৪৭২। ২৮ সেপ্টেম্বর বিমানটির যাত্রাপথ ছিল ফ্রান্সের প্যারিস থেকে জাপানের টোকিও শহরে। জাপান এয়ার লাইনসের মালিকানা বিমানটি নিয়মানুযায়ী যাত্রা বিরতির জন্য তৎকালীন ভারতের বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) শহরে অবতরন করে। যাত্রা বিরতির শেষে টোকিও ‘র উদ্দেশ্য রওনা দেয় ফ্লাইট ৪৭২। কিন্তু উড্ডয়নের কিচ্ছুক্ষণ পরই কমিউনিস্টপন্থী জাপানের সসস্ত্র জঙ্গি দল জাপানিজ রেড আর্মি’র(JRA) ৫ জন বন্দুকধারী সদস্য বিমানটি হাইজ্যাক করে। ৫ জনের দলের প্রধান ছিলেন ওসামু মারুওকা (Osamu Maruoka)।

বিমানে হাইজ্যাককারী ৫ জন সহ মোট যাত্রী ছিলেন ১৪২ জন। এছাড়াও ছিল ১৪ জন ক্রু মেম্বার। তারা সবাই ৫ জন বন্দুকধারীর কাছে জিম্মি হয়ে পরে। সব মিলিয়ে ১৫৬ জন মানুষ ছিল বিমানটিতে।ফ্লাইট ৪৭২

হাইজ্যাক হওয়ার পর হাইজ্যাকারদের নির্দেশে বিমানটি অবতরন করে ঢাকার তেঁজগাও এয়ারপোর্টে। সেখানে চলে ৫ দিনের এক রোমহর্ষক নেগোসিয়েশন পর্ব। বাংলাদেশের পক্ষে যেখানে নেতৃত্ব দেন এয়ার ভাইস মার্শাল এ. জি. মাহমুদ। অন্যদিকে হাইজ্যাকারদের পক্ষে ছিলেন ড্যানক(Danke) ছদ্মনামের একজন রেড আর্মি সদস্য। হাইজ্যাকারদের কথায় বোঝা যায় যে বাংলাদেশ একটি “স্বাধীন, ইসলামিক ও জনপ্রিয়” দেশ হওয়ার হাইজ্যাকাররা এখানে বাড়তি সুবিধা পাবেন ভেবে ঢাকায় অবতরন করেন। তারা জাপান সরকারের কাছে দাবী করেন তারা যেন জাপান সরকার হাইজ্যাকারদের  ৬ মিলিয়ন ইউ. এস. ডলার এবং জাপানের জেলেবন্দী তাদের ৯ জন কর্মীকে মুক্তি দেন।

এ.জি মাহমুদ অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ২৮, ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর রেডিও যোগে হাইজ্যাকারদের সাথে নেগোসিয়েশন চালিয়ে যান। তার এই বুদ্ধিদীপ্ত কাজ বিশ্বে ব্যাপক আলোচিত ও প্রশংসিত হয়।হাইজ্যাকারদের সাথে তিনি মধুর সুরে কথা বলে তাদের বিশ্বাস করাতে চান যে তাদের সাহায্যের জন্যই তিনি কাজ করছেন। এই ৩ দিন সময় ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ন ও রোমহর্ষক। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) তখন এই কার্যক্রম সম্পূর্ন লাইভ দেখায়।

অবশেষে ১ অক্টোবর জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টাকেও ফুকুদা(Takeo Fukuda) হাইজ্যাকারদের দাবী মেনে নিতে রাজি হন। এবং বলেন,” একটি মানুষের জীবনও আমার কাছে বিশ্বের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ”।

পরবর্তীতে ২ অক্টোবর জাপান এয়ার লাইনসের একটি বিশেষ বিমান ৬ মিলিয়ন ডলার এবং ৬ জন বন্দী নিয়ে ঢাকায় পৌছায়। এবং সেই দিনই ঐ ছয়জন কারাবন্দী ও অর্থের বিনিময়ে তারা ১১১ জন যাত্রী ও ক্রু মেম্বারকে মুক্তি দেয়। পরবর্তীতে তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও প্রথম প্রচেষ্টায় বিমানবন্দরে তৈরি করা ব্লকেজের জন্য ব্যর্থ হন। কিন্তু পরবর্তীতে ২য় চেষ্টায় তারা উড্ডয়নে সফল হন এবং কুয়েতের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যান। পরে সেখান থেকে দামিস্কে গেলে জ্বালানি ও খাবারের বিনিময়ে তারা আরো ১১ জনকে মুক্তি দেয়। সেখান থেকে আলজেরিয়ায় গেলে ওই দেশের সরকার বিমানটি বাজেয়াপ্ত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু হাইজ্যাকাররা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু কোনো হতাহত ছাড়াই বন্ধী বাকী সবাই মুক্তি পায়।

20210814 010910

এর আগেও ওসামু মারুওকা(Osamu Maruoka) ১৯৭৩ সালে জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৪০৪ সফলভাবে হাইজ্যাক করেন। ১৯৮৭ সালে জাল পাসপোর্টের মাধ্যমে জাপানের অনুপ্রবেশের পর তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং যাবতজীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। ২০১১ সালে জেলে তার মৃত্যু হয়। অন্য একজন হাইজ্যাকার জুন নিশিকাওয়া(Jun Nishikawa)’ও জাপানে ধরা পড়েন এবিং তাকেও যাবত জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। ১৯৭৭ এর ওই ঘটনার ২০ বছরের মধ্যেই সকল হাইজ্যাকারদের ধরতে সক্ষম হয় জাপান সরকার।

এয়ার ভাইস মার্শাল এ.জি. মাহমুদের চৌকস নেগোসিয়েশন ক্ষমতা ও জাপান সরকারের সময়পযোগী সিদ্ধান্তের ফলে ১৫১ জন নিরীহ মানুষের সবাই প্রাণে বেঁচে যান। যা প্লেন হাইজ্যাকের ইতিহাসে এক দৃষ্টান্ত। আমেরিকা ও ইউরোপে বিমান হাইজ্যাকারদের সাথে কোনো প্রকার সমজোতার নজির না থাকলেও এই সাফল্যের পর তারা নিজেদের পদ্ধতি পুনরায় ভেবে দেখতে বাধ্য হন।

আরো পড়ুন: বাংলার সুয়েজ খাল খ্যাত গাবখান চ্যানেল সম্পর্কে জেনে নিন।

আরো পড়ুন: কি ঘটেছিল উত্তর কোরিয়ায় বেড়াতে যাওয়া সেই আমেরিকান যুবক Otto warmbier এর সাথে?

আরো পড়ুন: রাশিয়ানদের সাগর গায়েব করার ইতিহাস।

আরো পড়ুন: ঢাকার সর্বপ্রথম মসজিদ সম্পর্কে জেনে নিন

আপনার মন্তব্য জানাবেন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নাম লিখুন